রিজার্ভ চুরিতে ছয় দেশের ৭০ জন চিহ্নিত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কর্মকর্তা অভিযুক্ত

Tanjir Khan Rony | প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, ১৯:১৩
রিজার্ভ চুরিতে ছয় দেশের ৭০ জন চিহ্নিত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কর্মকর্তা অভিযুক্ত

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ছয়টি দেশের অন্তত ৭০ জনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকিরা বিভিন্ন বিদেশি নাগরিক।

সিআইডি সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক এই অপরাধের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা।

মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। এ প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক লেনদেন ও হ্যাকারদের যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে, যা তদন্তে আন্তঃরাষ্ট্রীয় জটিলতা কাটাতে সহায়ক হয়েছে।

এর আগে জাপান ও ফিলিপাইনও এমএলএআরের মাধ্যমে নিজেদের তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশকে পাঠায়।

তদন্তে দেখা গেছে, সন্দেহভাজনদের মধ্যে প্রায় ৪০ জন ফিলিপাইনের নাগরিক।

এছাড়া উত্তর কোরিয়া, চীন, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের নাগরিকরাও জড়িত।

তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও ফৌজদারি আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনার প্রস্তুতি চলছে।

ড. আতিউর রহমানের বিরুদ্ধেও অন্তত দুটি অভিযোগ আনার কথা জানিয়েছে সিআইডি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তিন ধরনের অবহেলার অভিযোগ আনা হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে—ঝুঁকি বিবেচনা না করে আরটিজিএস ব্যবস্থা সরাসরি সুইফট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করা, সংবেদনশীল সুইফট সার্ভারের সঙ্গে এ সংযোগের অনুমোদন দেওয়া এবং হ্যাকারদের পাঠানো ম্যালওয়্যার যাচাই ছাড়াই ডাউনলোড করা।

এসব ঘটনায় ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট, আইটি অপারেশন, পেমেন্ট সিস্টেমসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা জড়িত বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হ্যাকাররা ইমেইলের মাধ্যমে সমন্বয় করে অর্থ সরিয়ে নেয় এবং ফিলিপাইনের চারটি ক্যাসিনো—ফিলরেম, ইস্টার্ন হাওয়াই, মিডাস ও সোলাইয়ার—ব্যবহার করে অর্থ পাচার করা হয়। ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) হয়ে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এসব ক্যাসিনোতে টাকা স্থানান্তর করা হয়েছিল।

এ ঘটনার পেছনে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সাইবার গ্রুপ ‘লাজারাস’ (এপিটি৩৮) জড়িত ছিল এবং এর নেতৃত্বে ছিলেন উত্তর কোরীয় নাগরিক পার্ক জিন ইউক।

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সুইফট পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়, যার মূল্য তখন প্রায় ৮১০ কোটি টাকা।

এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে ফিলিপাইন থেকে ১৪.৬৬ মিলিয়ন ডলার এবং শ্রীলঙ্কা থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার ফেরত পাওয়া গেছে, তবে বাকি অর্থ এখনও উদ্ধার হয়নি।

মামলাটির তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন। তিনি বলেন, কারা কীভাবে জড়িত তা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পর্যালোচনা কমিটি যুক্তরাষ্ট্রে চলমান মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত ঢাকায় এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল না করার সুপারিশ করেছে।

ইতোমধ্যে কমিটির প্রতিবেদন মন্ত্রিসভায় জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক।

মন্তব্য করুন

Login to comment

জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

Global Before Footer