ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনতে নতুন পথে হাঁটছে সরকার, এলএনজি রূপান্তরের পরিকল্পনা
Mousumi Nargis lucky |
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৭
দেশজুড়ে গ্যাস–সংকট এখন আর শুধু শিল্পকারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর আঁচ পৌঁছে গেছে রান্নাঘর থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত।
ক্রমেই কমে আসছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন, অথচ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় বাড়তি আমদানিও সহজ হচ্ছে না। এই টানাপোড়েনে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা ভোলার গ্যাসকে কাজে লাগাতে নতুন কৌশল নিতে যাচ্ছে জ্বালানি বিভাগ।
সরকারি সূত্র জানায়, ভোলার গ্যাস রূপান্তর করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হিসেবে জাহাজে করে ঢাকায় আনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার দিকে এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। এর মাধ্যমে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের গ্যাস–চাহিদার একটি অংশ মেটানোর আশা করা হচ্ছে।
এর আগে ভোলার গ্যাস সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিএনজি) আকারে ঢাকায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিগত সরকারের সময় শিল্পে গ্যাস–সংকট মোকাবিলার যুক্তিতে ইন্ট্রাকো নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই কাজের অনুমোদন পায়।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে সিলিন্ডারে ভরে সিএনজি আনা শুরু হলেও প্রত্যাশিত সাফল্য মেলেনি। যেখানে প্রতিদিন ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস আনার কথা ছিল এবং পরে তা বাড়িয়ে আড়াই কোটি ঘনফুটে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, সেখানে সর্বোচ্চ দিনে এসেছে মাত্র ৮ থেকে ৯ লাখ ঘনফুট। সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিমাণ আরও কমে এসেছে।
এই ব্যর্থতার পরই নতুন করে এলএনজি রূপান্তরের চিন্তা সামনে আসে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিদিন প্রায় তিন কোটি ঘনফুট গ্যাস ভোলা থেকে এনে শিল্পে সরবরাহ করা হতে পারে।
এ লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) ভোক্তা পর্যায়ে এলএনজির দাম নির্ধারণ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রতি ইউনিট এলএনজির সম্ভাব্য দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা, যা ভোলা থেকে আনা সিএনজির দামের সমান।
তবে এই মূল্য নির্ধারণ নিয়ে খাতসংশ্লিষ্ট অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের যুক্তি, ভোলায় স্থানীয়ভাবে শিল্প গড়ে তুললে তুলনামূলক কম দামে গ্যাস সরবরাহের কথা আগেই বলা হয়েছিল। বর্তমানে নতুন শিল্পকারখানায় সংযোগের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৪০ টাকা, আর ভোলায় শিল্প স্থাপিত হলে সেটি ৩০ টাকায় নামানোর কথাও আলোচনায় ছিল। সেই কাঠামো চূড়ান্ত না করেই এলএনজির দাম নির্ধারণে এগোনো হচ্ছে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উল্লেখ্য, ভোলায় বিনিয়োগ টানতে গত নভেম্বরে সরকারের তিনজন উপদেষ্টা সরেজমিনে সফর করেন। সরকারি অর্থায়নে সেখানে একটি সার কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণও হয়েছে।
পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিসিক শিল্পনগরী, বড় উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা শিল্পাঞ্চল এবং বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ইপিজেড করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।
এরই মধ্যে শেলটেকের একটি সিরামিক কারখানা সেখানে উৎপাদনে রয়েছে, আর প্রাণ-আরএফএল প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভোলার গ্যাস এলএনজি করে বাইরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ স্থানীয় বিনিয়োগে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
বিইআরসির শুনানিতে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ জুলফিকার আলী বলেন, এলএনজি রূপান্তর ও পরিবহনে প্রতি ইউনিট গ্যাসে প্রায় ২৯ টাকা ৯০ পয়সা খরচ ধরা হয়েছে। প্রতিদিন তিন কোটি ঘনফুট করে আনলে বছরে ব্যয় হবে প্রায় ৯৩০ কোটি টাকা, আর ১০ বছরে এই অঙ্ক দাঁড়াবে প্রায় ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। তাঁর মতে, এই বিপুল অর্থ ব্যয় না করে ভোলায় ২০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করাই বেশি যৌক্তিক।
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, ১ ঘনমিটার গ্যাস থেকে প্রায় ৪ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সেই বিদ্যুৎ ঢাকায় আনতে ইউনিটপ্রতি খরচ পড়বে মাত্র ১ টাকা ২৪ পয়সা, তাও নতুন কোনো বড় বিনিয়োগ ছাড়াই।
শুনানিতে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ভোলায় ভবিষ্যতে আরও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে পাইপলাইন স্থাপন করতেই হবে। সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়েই কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তিনি।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, অথচ সরবরাহ করা যাচ্ছে সর্বোচ্চ ২৭০ থেকে ২৭৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে ১০৫ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট। এই সংকট কাটাতে নতুন কূপ খননের মাধ্যমে অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ভোলায় দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ১২ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ৯ কোটি ঘনফুট। উৎপাদন বাড়াতে সেখানে নতুন কূপ খননের কাজও চলমান রয়েছে।
সব মিলিয়ে গ্যাস–সংকট মোকাবিলায় ভোলার গ্যাসকে কীভাবে, কোন পথে সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হবে—সেই সিদ্ধান্ত এখন জ্বালানি খাতের জন্য বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।